জরায়ু অপারেশন করালে কি হয়? কারণ, কুসংস্কার, বাস্তবতা

hysterectomy surgery and women health care

মেয়েদের শরীরে জরায়ু বা ইউটেরাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। তবে ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক জটিলতা ও জীবনের ঝুঁকির কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হিস্টারেক্টমি (Hysterectomy) বলা হয়।

অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে জরায়ু ফেলা নিয়ে সমাজের নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা তৈরি হয়। আজকে আমরা জানবো—কখন জরায়ু কেটে ফেলার প্রয়োজন পড়ে, এর ভুল ধারণাগুলো কী এবং অপারেশনের পর দাম্পত্য জীবনে কোনো প্রভাব পড়ে কি না।

জরায়ু কেটে ফেলার (Hysterectomy) প্রধান কারণসমূহ

অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতে, হুট করেই জরায়ু ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। মূলত রোগীর বয়স, সন্তান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং রোগের তীব্রতা বিবেচনা করে নিচের কারণগুলোতে জরায়ু অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়:

১. অতিরিক্ত ও অনিয়মিত রক্তপাত (DUB / Dysfunctional Uterine Bleeding): মাসিকের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত চাকা চাকা রক্ত যাওয়া এবং কোনো ওষুধে তা নিয়ন্ত্রণ না হওয়া। এর ফলে রোগী তীব্র রক্তশূন্যতায় (Anemia) ভোগেন। 

২. জরায়ুর টিউমার বা ফাইব্রয়েড (Fibroid Uterus): জরায়ুতে ছোট-বড় টিউমার বা মাংসপিণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া। 

৩. অ্যাডেনোমাইওসিস (Adenomyosis): জরায়ুর দেওয়াল মোটা হয়ে যাওয়া ও প্রচণ্ড তলপেটে ব্যথা হওয়া। 

৪. জরায়ুর সংক্রমণ বা আলসার (Chronic Cervicitis & Ulcers): জরায়ুমুখে দীর্ঘমেয়াদী ইনফেকশন, দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব এবং সহবাসের সময় প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বালাপোড়া করা। 

৫. ক্যান্সারের লক্ষণ বা ঝুঁকি: জরায়ুমুখের ক্যান্সার (Cervical Cancer) বা জরায়ু ক্যান্সারের প্রারম্ভিক ধাপে জটিলতা এড়াতে। ৬. ওভারিয়ান সিস্ট (Ovarian Cyst): ডিম্বাশয়ে জটিল সিস্ট থাকলে প্রয়োজনে জরায়ুর সাথে ওভারিও অপসারণ করা হয়।

কুসংস্কার ও ভুল ধারণা: "জিনের আসর বা জিন-ভূত"

গ্রামাঞ্চলে বা সঠিক সচেতনতার অভাবে অনেকেই জরায়ুর দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা (যেমন: তলপেটে ব্যথা, সহবাসে জ্বালাপোড়া বা রক্তপাত)-কে "জিন-ভূতের আসর" বা "বাতাস লাগা" মনে করে কবিরাজি চিকিৎসা ও ঝাড়ফুঁক করান।

চিকিৎসকদের মতে, এগুলো সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন কুসংস্কার। ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজির চক্করে পড়ে সঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে না গেলে রোগটি ভেতরে ভেতরে আরও জটিল রূপ ধারণ করে এবং পরবর্তীতে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

জরায়ু ফেলে দিলে কি দাম্পত্য বা স্বামী-সহবাসে সমস্যা হয়?

সামাজিক একটি বড় ভুল ধারণা হলো—জরায়ু কেটে ফেললে হয়তো স্বামী-সহবাসে সমস্যা হয় বা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়ে যায়।

চিকিৎসকদের স্পষ্ট বার্তা: জরায়ু অপসারণের সাথে স্বাভাবিক স্বামী-সহবাসের কোনো সরাসরি নেতিবাচক সম্পর্ক নেই। জরায়ু ফেলে দিলেও নারী স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করতে পারেন।

তবে অপারেশনের পর মানসিকভাবে প্রস্তুতি থাকতে হয় যে, পরবর্তীতে আর সন্তান হবে না এবং মাসিক (Period) স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

জরায়ু অপারেশনের পদ্ধতি ও আধুনিক প্রযুক্তি

বর্তমানে জরায়ু অপসারণের মূলত দুটি মাধ্যম রয়েছে:

ওপেন অ্যাবডোমিনাল হিস্টারেক্টমি (Open Surgery): পেট কেটে চিরাচরিত নিয়মে অপারেশন।

ল্যাপারোস্কোপিক হিস্টারেক্টমি (Laparoscopic Surgery): পেটে ছোট ছিদ্র করে লেজার/ক্যামেরার সাহায্যে আধুনিক উপায়ে অপারেশন। এটি দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

এছাড়া বর্তমানে পেটে যে সেলাই দেওয়া হয়, তা সাধারণত কসমেটিক সেলাই (Cosmetic Stitch)। এর ফলে বাইর থেকে সেলাইয়ের দাগ খুব একটা বোঝা যায় না এবং দেখতে পরিচ্ছন্ন থাকে।

শেষ কথা

জরায়ু সংক্রান্ত যেকোনো শারীরিক সমস্যা যেমন—অতিরিক্ত রক্তপাত, দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব কিংবা মিলনে অস্বাভাবিক ব্যথা অনুভব করলে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট না করে শুরুতেই একজন অভিজ্ঞ গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই পারে বড় ধরণের রোগ থেকে আপনাকে মুক্ত রাখতে।

✍️ লেখার উৎস ও সম্পাদকীয় নোট

এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন চিকিৎসকের প্রকাশিত আলোচনা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শের ভিত্তিতে Sohobas.com-এর নিজস্ব ভাষায় সহজ ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে বিষয়গুলো ধাপে ধাপে সাজিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

⚠️ চিকিৎসা সংক্রান্ত সতর্কতা

এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ জ্ঞান ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা বা সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Previous Post