কখন সহবাস করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি? বিস্তারিত গাইড
গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন এমন দম্পতিদের জন্য সঠিক সময় জানা অত্যন্ত জরুরি। নারীর মাসিকের চক্রে এমন কিছু নির্দিষ্ট দিন থাকে যখন সন্তানধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়টিকে বলা হয় 'ফার্টাইল উইন্ডো' (Fertile Window)। আজকের লেখায় আমরা আলোচনা করব কীভাবে খুব সহজেই আপনার শরীরের লক্ষণ ও কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে দ্রুত গর্ভধারণের সঠিক সময় চিহ্নিত করবেন।
১. জরায়ুমুখের সাদাস্রাব (Cervical Mucus) পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি
প্রতি মাসে নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে চার ধরনের সাদাস্রাব বা ডিসচার্জ দেখা যায়। এই সাদাস্রাব দেখে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বোঝার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- প্রথম অবস্থা (মাসিকের পরপরই): এ সময় কোনো সাদাস্রাব থাকে না এবং মাসিকের রাস্তা শুষ্ক মনে হয়। এ অবস্থায় গর্ভধারণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ (প্রায় ০.৩%)।
- দ্বিতীয় অবস্থা: মাসিকের রাস্তা হালকা ভেজা মনে হয়, তবে হাতে ধরা যায় এমন কোনো সাদাস্রাব থাকে না। এ সময় গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ১.৩%।
- তৃতীয় অবস্থা: এ সময় একটু ঘন এবং আঙুলে লাগলে আঠালো মনে হয় এমন সাদাস্রাব দেখা যায়। এ সময় সন্তানধারণের সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২.৫%।
- চতুর্থ অবস্থা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ): এ সময় সাদাস্রাব খুব পাতলা, স্বচ্ছ এবং কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো মসৃণ ও পিচ্ছিল হয়। আঙুল দিয়ে টানলে কয়েক ইঞ্চি বড় করা যায় কিন্তু ভাঙে না। এ অবস্থায় গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ২৮.৬% বা ৩০%)।
করণীয়: সাদাস্রাবের তৃতীয় অবস্থা শুরু হওয়া মাত্রই সহবাসের চেষ্টা শুরু করতে হবে এবং চতুর্থ অবস্থা শেষ হওয়ার পর আরও ৩ দিন পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
২. শরীরের ভিত্তিমূল তাপমাত্রা (Basal Body Temperature) মাপা
ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বের হওয়ার (Ovulation) পর নারীর শরীরের তাপমাত্রা সামান্য (Degrees Celsius-এ প্রায় ০.২°C বা Fahrenheit-এ ০.৪°F) বৃদ্ধি পায়। এটি মাপার নিয়ম:
- সঠিক সময়ে মাপা: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর, বিছানা ছাড়ার আগেই তাপমাত্রা মাপতে হবে।
- ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার: সাধারণ জ্বর মাপার থার্মোমিটারের বদলে সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করতে হবে এবং থার্মোমিটারটি জিহ্বার নিচে রাখতে হবে।
- ৬ এর পর ৩ নিয়ম: টানা ৬ দিন কম তাপমাত্রার পর যদি টানা ৩ দিন বেশি তাপমাত্রা থাকে, তবে বুঝতে হবে ওভুলেশন হয়েছে।
নোট: তাপমাত্রা বাড়ার ৩য় দিন পর্যন্ত ফার্টাইল উইন্ডো থাকে। তাই সাদাস্রাব যাওয়া শুরু হওয়া থেকে শুরু করে তাপমাত্রা বৃদ্ধির তৃতীয় দিন পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
৩. ক্যালেন্ডার বা নির্দিষ্ট দিন গণনা পদ্ধতি
যাদের মাসিক নিয়মিত (২৬ থেকে ৩২ দিনের সাইকেল), তারা সাধারণ ক্যালেন্ডার হিসেব অনুসরণ করতে পারেন:
- মাসিক শুরু হওয়ার ৮ম দিন থেকে ১৯তম দিন পর্যন্ত সময়টিকে ফার্টাইল উইন্ডো হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এই সময়ে নিয়মিত সহবাস করলে গর্ভধারণের সুযোগ অনেক বৃদ্ধি পায়।
৪. দীর্ঘমেয়াদী মাসিকের সাইকেল হিসাব পদ্ধতি
গত ৬ মাসের মাসিকের হিসেব রেখে আরও নিখুঁতভাবে সময় বের করা সম্ভব।
- ফার্টাইল উইন্ডোর শুরু: আপনার সবচেয়ে ছোট মাসিকের সাইকেলের দিন সংখ্যা থেকে ১৮ বিয়োগ করুন।
- ফার্টাইল উইন্ডোর শেষ: আপনার সবচেয়ে লম্বা মাসিকের সাইকেলের দিন সংখ্যা থেকে ১১ বিয়োগ করুন।
- উদাহরণ: আপনার সবচেয়ে ছোট সাইকেল যদি ২৬ দিন হয়, তবে (২৬ - ১৮) = ৮ম দিন থেকে ফার্টাইল উইন্ডো শুরু। আর সবচেয়ে লম্বা সাইকেল ৩৩ দিন হলে, (৩৩ - ১১) = ২২তম দিন পর্যন্ত ফার্টাইল উইন্ডো শেষ। অর্থাৎ ৮ম থেকে ২২তম দিন পর্যন্ত সময়টি আপনার জন্য কার্যকর।
সতর্কতা: মাসিকের সাইকেল গণনার সময় সবসময় মাসিক শুরু হওয়ার দিন থেকে গণনা করবেন, মাসিক শেষ হওয়ার দিন থেকে নয়।
৫. গর্ভধারণের পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ
- নারীর ওভারি থেকে বের হওয়া একটি পরিপক্ক ডিম্বাণু সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা জীবিত থাকে।
- অন্যদিকে, পুরুষের শুক্রাণু নারীর শরীরে সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
- তাই ডিম্বাণু বের হওয়ার আগেই যদি শুক্রাণু নালীতে উপস্থিত থাকে, তবেই সন্তানধারণের সম্ভাবনা সর্বোচ্চ থাকে।
৬. অন্যান্য সহায়ক উপায়সমূহ
- ওভুলেশন কিট (Ovulation Kit): ফার্মেসিতে পাওয়া যায়, যা প্রস্রাবে হরমোনের মাত্রা মেপে ওভুলেশনের সময় বলে দেয়।
- মোবাইল অ্যাপস: Clue বা Flo-এর মতো ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করে সাইকেলের একটি সার্বিক ধারণা পাওয়া যায়।
৭. কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
সঠিক নিয়ম ও সময় মেনে নিয়মিত সহবাস করলে ৮০%-এরও বেশি দম্পতি ১ বছরের মধ্যে সফল হন। তবে:
- ১ বছর ধরে নিয়মিত চেষ্টা করার পরও সাফল্য না এলে বন্ধ্যাত্ব বা অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ৬ মাস চেষ্টার পরেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
