গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যত্ন ও স্বাস্থ্য সচেতনতা: বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যত্ন নিয়ে ডা. জয়শ্রী সাহার বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

‎গর্ভকালীন সময়ে মা ও গর্ভস্থ শিশু দুজনেরই সুস্থতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই কিছু বিশেষ যত্ন ও নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। নিচে গর্ভবতী মায়েদের করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

‎গর্ভকালীন পুষ্টি ও খাদ্যতালিকাঃ

‎গর্ভাবস্থার আগের স্বাভাবিক খাদ্যঅভ্যাস বজায় রাখার পাশাপাশি খাবারের পরিমাণ কিছুটা বাড়াতে হবে। যেমন—এক মুঠ ভাত বা দুই চামচ ডাল বেশি খাওয়া। ডায়েটে প্রচুর শাকসবজি, প্রোটিন, দুধ এবং তাজা ফলমূল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিয়মিত আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আয়রন এবং ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট কখনো একসাথে খাওয়া যাবে না; কারণ এতে শরীরে ওষুধের সঠিক শোষণ (Absorption) হয় না।

‎চলাফেরা, ব্যায়াম ও শারীরিক সম্পর্কঃ

‎গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা বা রক্তপাত (Bleeding) না থাকলে সারাদিন শুয়ে থাকার প্রয়োজন নেই, স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম ও হালকা ব্যায়াম করা যাবে। তবে ভারী কাজ করা বা দূরপাল্লার লম্বা জার্নি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাস এবং শেষের ২ মাস শারীরিক সম্পর্ক বা ফিজিক্যাল রিলেশন বন্ধ রাখতে হবে।

‎কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধঃ

‎গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation) খুব সাধারণ একটি সমস্যা। এটি প্রতিরোধে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, ফলমূল ও দুধ খেতে হবে। প্রয়োজনবোধে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ল্যাক্সেটিভস (Laxatives) ব্যবহার করা যেতে পারে।

‎পোশাক ও জুতা নির্বাচনঃ

‎পড়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনা এড়াতে হাই হিল পরা থেকে একদম বিরত থাকতে হবে। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের আরামের জন্য ঢিলাঢালা সুতির পোশাক নির্বাচন করা উচিত।

‎টিকাদানঃ

‎গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি-এর নতুন করে টিকাদান মানা করা হয় (যদি আগের ৩টি ডোজ সম্পূর্ণ না থাকে)। যদি টিটেনাস (TT) টিকার পূর্বে ৫টি ডোজ সম্পন্ন না থাকে, তবে গর্ভাবস্থার ৫ম মাসে ১ম টি এবং ৬ষ্ঠ মাসে ২য় টি (১ মাসের ব্যবধানে ২টি) টিকা নিতে হবে। পূর্বে ৫টি ডোজ নেওয়া থাকলেও যদি তা ৫ বছরের বেশি আগের হয়, তবে গর্ভাবস্থায় ১টি বুস্টার ডোজ নিতে হবে।

‎ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাঃ

‎প্রতিদিন সাবান ও শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করা এবং প্রাইভেট পার্টস সবসময় পরিষ্কার রাখা জরুরি। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে এবং কখনো প্রস্রাব আটকে রাখা যাবে না। গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু প্রস্রাব আটকে রাখলে ইউরিন ইনফেকশনের (UTI) ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

‎ডাক্তারি পরীক্ষা ও অ্যান্টিন্যাটাল চেকআপঃ

‎গর্ভবতী মা ও শিশুর সুরক্ষায় প্রথম ৩ মাসের মধ্যে প্রেগন্যান্সি নিশ্চিত হওয়া ও বেসলাইন টেস্ট করার জন্য অবশ্যই ভিজিট করা উচিত। এরপর থেকে ৭ মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ১ বার, ৮ম ও ৯ মাস পর্যন্ত প্রতি ২ সপ্তাহে ১ বার এবং ৯ মাসের পর প্রসবের আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে ১ বার ডাক্তার দেখাতে হবে।
‎
‎বেসলাইন ব্লাড ও ইউরিন টেস্টের মাধ্যমে রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা প্রস্রাবে ইনফেকশন আছে কিনা তা জানা যায়। ব্লাড গ্রুপিং এবং আরএইচ (Rh) টাইপিং জানা না থাকলে তা প্রথম ভিজিটেই করিয়ে নিতে হবে। এছাড়া আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (USG) পরীক্ষার মাধ্যমে বাচ্চার বয়স, হার্টবিট (Heartbeat) নিশ্চিত করা হয় এবং সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ (EDD) নির্ধারণ করা হয়।

‎গর্ভস্থ শিশুর নড়াচড়া পর্যবেক্ষণঃ

‎বিশেষ করে গর্ভাবস্থার ৮ম মাস থেকে বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ অবস্থায় ১২ ঘণ্টায় শিশু কমপক্ষে ১০ বার নড়লে বুঝতে হবে সে সুস্থ আছে। নড়াচড়া কম মনে হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে বাচ্চার হার্টবিট, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বা সিটিজি (CTG) পরীক্ষার মাধ্যমে বাচ্চার অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।

‎প্রসবের পূর্বপ্রস্তুতিঃ

‎গর্ভাবস্থার শেষদিকে মা ও পরিবারের সাথে আলোচনা করে একটি সঠিক পরিকল্পনা করা হয়—যেমন ডেলিভারি কীভাবে হবে (স্বাভাবিক বা ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি নাকি সিজারিয়ান সেকশন), কোথায় করা হবে এবং আর্থিক প্রস্তুতি কেমন থাকবে। এছাড়া রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে জরুরি মুহূর্তের জন্য ১ থেকে ২ জন রক্তদাতা (Blood Donor) আগে থেকেই রেডি রাখতে হবে।
‎
‎উপসংহার: সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতাই পারে একজন গর্ভবতী মা-কে সুস্থ রাখতে এবং একটি সুন্দর ও সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে।

পরামর্শঃ
‎ডা. জয়শ্রী সাহা
‎অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ
(সোর্সঃ তার ইউটুউব থেকে নেয়া)
‎

‎
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url