মেয়েদের যোনিপথের স্রাব বা সাদা স্রাব: কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা রোগের লক্ষণ?
লজ্জার কারণে মেয়েদের যোনিপথের স্রাব বা সাদা স্রাব বিষয়ে আমাদের অনেকেরই জানা-শোনা খুব কম। ফলে দেখা যায়, অনেকে অসুস্থ হয়েও বাসায় বসে থাকেন, আবার অনেকে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও স্রাব নিয়ে অনর্থক দুশ্চিন্তা করেন। আজ আমরা জানবো স্বাভাবিক সাদা স্রাব কত প্রকারের হতে পারে এবং কোন ৫ ধরনের স্রাব দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
১. স্বাভাবিক সাদা স্রাব কেমন হয়?
- ঘনত্ব: এটি দইয়ের মতো ঘন হতে পারে, কিছুটা পাতলা হতে পারে, একদম দুধ বা পানির মতো পাতলা হতে পারে, অথবা ডিমের সাদা অংশের মতো বা জেলির মতো হতে পারে (যেটি অনেক সময় টানলে সহজে ভাঙে না)।
- রং: সাধারণত দুটি রং দেখা যায়—সাদা অথবা একদম স্বচ্ছ (ডিমের সাদা অংশের মতো, যার কোনো রং নেই)।
- পরিমাণ: দিনে ২ থেকে ৫ মিলিলিটার (mL) পর্যন্ত স্রাব যাওয়া একদম স্বাভাবিক। এর চেয়ে সামান্য কম বা বেশিও হতে পারে। মাসের একেক সময়ে এবং একেক মানুষের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
- জরুরি তথ্য: সাদা স্রাব বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি শরীরের কোনো ক্ষতি করে না বা শরীর দুর্বল করে না; বরং এটি যোনিপথ বা মাসিকের রাস্তা পরিষ্কার রাখে এবং ইনফেকশন থেকে সুরক্ষা দেয়।
২. অস্বাভাবিক বা ৫ ধরনের ক্ষতিকর স্রাব (রোগের লক্ষণ)
আপনার জন্য যতটুকু স্রাব স্বাভাবিক, তার থেকে বেশি যাওয়া শুরু করলে অথবা রঙের পরিবর্তন হলে তা রোগের লক্ষণ হতে পারে:
সাদা চাকা চাকা স্রাব (পনির বা দইয়ের মতো):
- লক্ষণ: স্রাবের সাথে মাসিকের রাস্তায় বেশ চুলকানি, প্রস্রাব করার সময় বা সহবাসের সময় ব্যথা ও জ্বালাপোড়া হতে পারে।
- কারণ: এটি এক ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা ইস্ট ইনফেকশন (ক্যান্ডিডা ফাঙ্গাসের কারণে হয়)।
- চিকিৎসা: অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ (মুখে খাওয়ার বা মাসিকের রাস্তায় ব্যবহারের) দিলে ১-২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। ( চিকিৎসক এর পরামর্শ ছাড়া কোন এন্টিবায়োটিক গ্রহন করবেন না )
ধূসর বা ছাই রঙের স্রাব:
- লক্ষণ: পচা মাছের মতো তীব্র দুর্গন্ধ থাকে। সাধারণত তীব্র ব্যথা বা চুলকানি থাকে না।
- কারণ: যোনিপথের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে (ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজিনোসিস) এটি হয়।
- চিকিৎসা: ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট, ক্রিম বা জেল ব্যবহার করতে হয়।
সবুজ রঙের বা হলুদ রঙের স্রাব:
- লক্ষণ: তলপেটে ব্যথা এবং প্রস্রাবের রাস্তায় জ্বালাপোড়া হতে পারে।
- কারণ: এটি 'গনোরিয়া' নামক যৌনবাহিত রোগের কারণে হতে পারে।
- সতর্কতা: সময়মতো চিকিৎসা না করালে পরবর্তীতে বাচ্চা নিতে সমস্যা হতে পারে। এতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই চিকিৎসা প্রয়োজন এবং রোগ না সারা পর্যন্ত সহবাস বন্ধ রাখা উচিত।
সবুজ-হলুদ মেশানো (ফেনার মতো) স্রাব:
- লক্ষণ: স্রাব পাতলা, ঘন বা ফেনার মতো হতে পারে। সাথে মাসিকের রাস্তায় চুলকানি, প্রস্রাবে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হতে পারে।
- কারণ: 'ট্রিকোমোনাসিস' (Trichomoniasis) নামক যৌনবাহিত রোগের কারণে হয়।
- চিকিৎসা: ডাক্তারের পরামর্শে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এটি পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব (স্বামী-স্ত্রী উভয়ের চিকিৎসা জরুরি)।
লাল বা রক্তযুক্ত স্রাব (বিপদচিহ্ন):
কখন স্বাভাবিক: মাসিকের শুরুতে লালচে স্রাব বা মাসিকের শেষ দিকে কালচে স্রাব যাওয়া স্বাভাবিক।
কখন ডাক্তার দেখাবেন:
- মাসিক ছাড়া অন্য সময়ে লাল স্রাব বা রক্ত গেলে (জরায়ু-মুখের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে)।
- সহবাসের পর রক্তপাত হলে (ইনফেকশন বা জরায়ু-মুখের/যোনিপথের সমস্যার কারণে)।
- মেনোপজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর (বয়স ৪৫+ এবং ১ বছর ধরে মাসিক বন্ধ থাকার পর) যদি সামান্যতম রক্ত, গোলাপি, কালচে বা বাদামি স্রাবও দেখা যায়, তবে অবিলম্বে গাইনোকোলজিস্টের কাছে যেতে হবে। এটি জরায়ু ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
৩. যোনিপথ সুস্থ রাখার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ টিপস
- ভেতরের অংশ পরিষ্কার করবেন না: যোনিপথের ভেতর সাবান, সুগন্ধি, ডুস বা পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে যাবেন না। যোনিপথ নিজেকে নিজেই পরিষ্কার রাখে।
- বাইরের অংশের সঠিক যত্ন: বাইরের অংশটুকু পানি এবং সাধারণ সুগন্ধিহীন সাবান দিয়ে ধুয়ে ভালো করে শুকিয়ে নিন।
- অন্তর্বাস: সবসময় সুতি (Cotton) কাপড়ের অন্তর্বাস ব্যবহার করুন।
- পোশাক: অতিরিক্ত টাইট অন্তর্বাস বা পায়জামা পরা থেকে বিরত থাকুন।
- ওষুধের নিয়ম: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে কখনোই কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাবেন না। আর শুধু উপসর্গ দেখে কারণ নিশ্চিত করা যায় না। পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে সঠিক কারন বের করতে হবে।
