গর্ভাবস্থায় সহবাস কি নিরাপদ? কত মাস পর্যন্ত করা যাবে? বিস্তারিত এবং সতর্কতা
গর্ভাবস্থা বা প্রেগনেন্সি নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া (Physiological Process)। এ সময় স্বাভাবিক কাজকর্ম বা জীবনযাপনে সাধারণত কোনো বড় বাধা থাকে না। তবে গর্ভকালীন সময়ে সহবাস করা কতটা নিরাপদ, কোন সময়গুলোতে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং কাদের জন্য সহবাস পুরোপুরি নিষেধ—তা নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন ও ভুল ধারণা থাকে।
আজকের নিবন্ধে খ্যাতনামা গাইনোকোলজিস্ট ও ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্টদের মতামতের ভিত্তিতে গর্ভকালীন সহবাসের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা আলোচনা করা হলো।
গর্ভাবস্থায় সহবাস কি করা যাবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, করা যাবে। স্বাভাবিক ও জটিলতাহীন প্রেগনেন্সিতে শারীরিক মিলনে কোনো বড় বাধা নেই। তবে চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট কিছু সময়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা বা মিলনের ফ্রিকোয়েন্সি (ঘনত্ব) কিছুটা কমিয়ে আনা ভালো।
গর্ভাবস্থার কোন সময়ে সহবাস ঝুঁকিপূর্ণ?
গর্ভাবস্থাকে মূলত ৩টি ভাগে (Trimester) ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ১ম ও ৩য় ট্রাইমেস্টারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন:
১. প্রথম ৩ মাস (First Trimester / প্রথম ১২ সপ্তাহ)
- কেন ঝুঁকিপূর্ণ: গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে জরায়ুতে ভ্রূণ বা বাচ্চা সঠিকভাবে প্রতিস্থাপিত (Implantation) হতে থাকে এবং বাচ্চার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (Organogenesis) তৈরি হয়। অনেক সময় এই সময়ে গর্ভস্থ শিশু পুরোপুরি আসন জাঁকিয়ে বসতে পারে না।
- সতর্কতা: এ সময় অতিরিক্ত জোরপূর্বক বা অসাবধানতাবশত সহবাস করলে গর্ভপাত বা অ্যাবরশনের (Abortion) ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই প্রথম ১২ সপ্তাহ মিলনের ফ্রিকোয়েন্সি কম রাখা বা যথাসম্ভব পরিহার করা নিরাপদ। মিলন করলেও খুব হালকা ও সতর্কভাবে করা উচিত।
২. মধ্যবর্তী সময় (Second Trimester / ১৩ থেকে ২৭ সপ্তাহ)
- পরিস্থিতি: যদি মায়ের কোনো শারীরিক জটিলতা না থাকে, তবে এ সময় সহবাস করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। এটি গর্ভাবস্থার সবচেয়ে আরামদায়ক সময় হিসেবে গণ্য করা হয়।
৩. শেষ ৩ মাস (Third Trimester / বিশেষ করে ২৮ থেকে ৪০ সপ্তাহ বা শেষ ৬ সপ্তাহ)
- কেন ঝুঁকিপূর্ণ: এ সময়ে গর্ভস্থ শিশু বড় হয়ে যায় এবং মায়ের পেট প্রসারিত (Abdomen enlarged) হওয়ার কারণে চলাফেরা, শোয়া বা ঘুমানোই বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
- সতর্কতা: শেষ দিকে বিশেষ করে ৮ মাস পর থেকে মিলনের ফলে সময়ের আগেই ওয়াটার ব্রেক বা পানি ভেঙে যেতে পারে কিংবা সময়ের আগেই প্রসব বেদনা (Preterm Labor) শুরু হতে পারে। তাই ৮ মাস থেকে ডেলিভারির আগ পর্যন্ত সহবাস না করাই ভালো।
গর্ভাবস্থায় যাদের জন্য সহবাস সম্পূর্ণ নিষেধ (হাই-রিস্ক প্রেগনেন্সি)
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সহবাস করা গেলেও, নিচের শারীরিক সমস্যা বা জটিলতা থাকলে চিকিৎসকরা সহবাস থেকে একদম বিরত থাকার পরামর্শ দেন:
১. বারবার গর্ভপাতের ইতিহাস (History of Recurrent Abortion): পূর্বে একাধিকবার (৩-৪ বার) বাচ্চা নষ্ট হওয়ার ইতিহাস থাকলে।
২. গর্ভকালীন রক্তক্ষরণ (Bleeding in Pregnancy): গর্ভাবস্থার যেকোনো সময়ে যোনিপথে হালকা রক্তপাত বা স্পটিং দেখা দিলে।
৩. ফুল বা প্লাসেন্টা নিচে থাকা (Placenta Previa): আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে যদি দেখা যায় বাচ্চার ফুল (প্লাসেন্টা) জরায়ুর মুখের ওপর বা নিচের দিকে আছে, তবে সহবাস করলে মারাত্মক রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে।
৪. সময়ের আগে বাচ্চা হওয়ার প্রবণতা (Preterm Labor Risk): আগের প্রেগনেন্সিতে সময়ের আগেই ডেলিভারি হওয়ার ইতিহাস থাকলে।
৫. জরায়ুর তরল বা পানি বেশি থাকা: পেটে তরলের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে বা পেটে কোমরবিডিটিজনিত তীব্র ব্যথা থাকলে।
৬. অন্যান্য জটিলতা: গর্ভবতী মায়ের উচ্চ রক্তচাপ (High BP), অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা বাচ্চার নড়াচড়া (Fetal Movement) কম থাকলে।
গর্ভকালীন সহবাসের সময় কিছু অত্যন্ত জরুরি সতর্কতা
- গর্ভের ওপর চাপ না ফেলা (Safe Positions): সহবাসের সময় এমন কোনো পজিশন বা ভঙ্গিমা ব্যবহার করা যাবে না, যাতে মায়ের পেটে বা গর্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
- পুরুষ সঙ্গীর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা (Hygiene): শারীরিক মিলনের মাধ্যমে যেন বাইরে থেকে মায়ের জরায়ুতে কোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ইনফেকশন প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য পুরুষ সঙ্গীকে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।
- জোরজবরদস্তি পরিহার: গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক ইচ্ছাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিন।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
গর্ভাবস্থা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়, কারণ এখানে মা ও শিশু—দুইটি অমূল্য জীবনের সুরক্ষা জড়িত। সামান্য অসাবধানতা যেন কোনো বড় বিপদের কারণ না হয় । গর্ভকালীন যেকোনো জটিলতা বা প্রশ্ন থাকলে লজ্জা না পেয়ে সরাসরি একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের (Gynecologist) পরামর্শ নিন।
