জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়ার সঠিক নিয়ম, ক্ষতি, সতর্কতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল বা খাবার বড়ি অন্যতম একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের পিল—যেমন সুখী, ফেমিকন, ফেমি পিল বা নডেট ২৮ (যাতে ২১টি হরমোনযুক্ত সাদা বড়ি এবং ৭টি আয়রনযুক্ত লাল বড়ি থাকে)—কীভাবে সঠিক নিয়মে সেবন করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মাঝেই নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। সঠিক নিয়মের অভাবে অনেক সময় অনিয়মিত রক্তপাত বা অপরিকল্পিত গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটে থাকে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানব পিল খাওয়ার সঠিক নিয়ম, কোনো কারণে ডোজ মিস হলে করণীয়, কাদের জন্য পিল সেবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো কী কী।
১. জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়ার সঠিক নিয়ম
বাজারে প্রচলিত বেশিরভাগ কম্বিনেশন পিলের পাতায় ২১টি সাদা বড়ি (হরমোনযুক্ত) এবং ৭টি লাল বড়ি (আয়রনযুক্ত) থাকে। এগুলো সেবনের সাধারণ নিয়মগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- কখন শুরু করবেন: মাসিকের প্রথম দিন থেকে (সাইকেলের ডে-১) এই ওষুধগুলো খাওয়া শুরু করা সবচেয়ে ভালো। তবে মাসিকের প্রথম ৫ দিনের মধ্যে যেকোনো দিন এটি শুরু করা যেতে পারে।
- সাদা বড়ি খাওয়ার নিয়ম: প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে ১টি করে সাদা বড়ি টানা ২১ দিন খেতে হবে। রাতের বেলা বা ঘুমানোর আগে খেলে বমি বমি ভাব কম হয়।
- লাল বড়ি খাওয়ার নিয়ম: ২২তম দিন থেকে পরবর্তী ৭ দিন প্রতিদিন ১টি করে লাল বড়ি খেতে হবে। এই লাল বড়িগুলোতে কোনো হরমোন থাকে না, এগুলোতে আয়রন থাকে। সাদা বড়ি খাওয়া বন্ধ করার কারণেই মূলত মাসিক হয়; লাল বড়ি খাওয়ার জন্য মাসিক হয় বিষয়টি এমন নয়। লাল বড়ি চলাকালীন সময়েই সাধারণত মাসিক হয়ে যায়। মাসিক হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট নিয়মে ৭টি লাল বড়ি শেষ করতে হবে এবং পাতা শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই নতুন পাতা শুরু করতে হবে।
২. পিল খেতে ভুলে গেলে বা মিস হলে কী করবেন?
নিয়মিত একই সময়ে পিল খাওয়া উচিত। তবে ভুলবশত পিল মিস হয়ে গেলে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
- ১টি সাদা বড়ি মিস হলে: পরবর্তী দিন যখনই মনে পড়বে, মিস হয়ে যাওয়া বড়িটি সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে নিতে হবে এবং ওই দিনের নিয়মিত ডোজও যথারীতি চালিয়ে যেতে হবে।
- পরপর ২ দিন সাদা বড়ি মিস হলে: পরবর্তী দিন মনে পড়ার সাথে সাথে আগের দিনের ২টি ট্যাবলেট একসাথে খেয়ে নিতে হবে এবং ওই দিনের ডোজও চালিয়ে যেতে হবে। তবে টানা ২ দিন পিল মিস হলে পরবর্তী ৭ দিন মেলামেশার সময় অবশ্যই কনডম ব্যবহার করতে হবে।
- দীর্ঘ সময় বা একাধিক পিল মিস হলে: যদি ৩ দিন বা তার বেশি সময় পিল খাওয়া বাদ পড়ে যায়, তবে ওই সাইকেলের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং অতিরিক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন: কনডম) ব্যবহার করা জরুরি।
৩. কাদের জন্য পিল সেবন নিরাপদ নয়?
সকলের জন্য ওরাল পিল উপযুক্ত বা নিরাপদ নাও হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যায় এই পিলগুলো সেবন করা সম্পূর্ণ নিষেধ অথবা ডাক্তারের বিশেষ পরামর্শ সাপেক্ষে নিতে হয়:
- নিষেধাজ্ঞা: পায়ে তীব্র ব্যথা, পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস (থ্রম্বোসিস) থাকলে এই পিল খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।
- ডাক্তারি পরামর্শ প্রয়োজন: লিভারের সমস্যা, জন্ডিস বা উচ্চ রক্তচাপের (হাই ব্লাড প্রেসার) রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শ ও নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে পিল সেবন করতে পারেন।
- বড় সার্জারি: যদি সামনে কোনো বড় অপারেশন বা সার্জারি থাকে, তবে অপারেশনের অন্তত ৪ সপ্তাহ আগ থেকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পিল খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে।
- স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য: যারা ব্রেস্টফিডিং করাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেনযুক্ত পিলের বদলে প্রজেস্টেরন-অনলি পিল বা ডক্টর-প্রস্তাবিত পিল ব্যবহার করতে হবে।
৪. পিল খাওয়ার সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের পিলগুলোতে সাধারণত বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব একটা থাকে না। তবে শুরুর দিকে কিছু হালকা (Mild to Moderate) সমস্যা দেখা দিতে পারে:
- বমি ভাব বা মাথা ঘোরা
- হালকা মাথা ব্যথা
- মুড সুইং বা মেজাজ খিটখিটে হওয়া
- দুই মাসিক চক্রের মাঝামাঝি সময়ে হালকা রক্তপাত
- স্তনে হালকা ব্যথা বা সামান্য ওজন বৃদ্ধি
সাধারণত শরীর হরমোনের সাথে মানিয়ে নিলে ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে এই সমস্যাগুলো দূর হয়ে যায়। তবে যদি তীব্র মাথা ব্যথা, বুকে ব্যথা বা চোখে ঝাপসা দেখার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সতর্কতা: যেকোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বা ওরাল পিল নিয়মিত শুরু করার আগে আপনার শরীরের শারীরিক গঠন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
